• Tue. May 24th, 2022

BograOnline.Com

Online News Portal

গুম পরিস্থিতি: একদিনে নিখোঁজ আওয়ামী লীগের চারজন, পাঁচ বছরেও খোঁজ মেলেনি 

Byadmin

Feb 12, 2022

বাংলাদেশের গুমের অভিযোগগুলোর যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত হয় না বলে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা জানিয়ে আসছে দেশি বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলো। এমনই একটি অভিযোগ নরসিংদীর রায়পুরার যুবলীগ নেতা আজিজুল ইসলামের স্ত্রী রানু আরা বেগমের। 

তিনি বলেন একসাথে চারজনকে ধরে নেয়ার পর প্রায় ৫ বছর ধরে সবাই নিখোঁজ। তার কথায়, “পুলিশ কোনো তদন্ত করে নাই। চারটা লোক নিয়া গেছে। পুলিশ কি তদন্ত করবে কি, তারাই তো ধরে নিছে”

ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, ২০১৭ সালের ২৬শে মে বাঁশগাড়ী ইউনিয়ন থেকে সাধারণ মানুষের সামনে থেকে রূপ মিয়া মেম্বার, আজিজুল ইসলাম, হাবিব মেম্বার ও জাকির নামের চারজনকে ধরে নিয়েছিল পুলিশ। এই চারজনই ছিল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মী।

আজিজুল ইসলামের ভাই হরুন মিয়া বলেন, “আমরা ভাবছি পরের দিন চালান দিব। পরের দিন থানায় গেছে দেখে না থানায় লোক নাই। থানায় লোক নাই। কোর্টে লোক নাই। জেলে লোক নাই, লোক গেল কই।” 

নিখোঁজ আজিজুল ইসলামের পরিবার জানায় স্থানীয় যুব লীগের নেতা ছিলেন আজিজুল। তার স্ত্রী রানু আরা বেগম দাবি করেন তার স্বামীকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে এটা তিনিসহ এলাকার শত শত মানুষ দেখেছে।

নিখোজ আজিজুল ইসলামের পরিবারের দাবি চোখের সামনে পুলিশ চারজনকে ধরে নিয়েছে

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “বলার মতো কোনো ভাষাই আমার কাছে নাই। তারপরেও বলি। আমার বাচ্চাগুলোর দিক তাকায়া আপনারা চেষ্টা করেন। আমার তিনটা বাচ্চা। আমি কীভাবে চালাবো। মানুষের বাড়ি থাইকা কাজ কইরা আইনা আইনা খাই। এমনও দিন যায় পোলাপানরে না খাওয়াইয়া রাখি।”

পরিবার এবং স্থানীয়দের দাবি আজিজুলকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায় রূপ মিয়া মেম্বারের সাথে। বাঁশগাড়ী ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মারামারি সংঘর্ষের মামলায় আসামী ছিলেন রূপ মিয়া মেম্বার। তার স্ত্রী নাসিমার প্রশ্ন অপরাধ করলে সাজা হোক কিন্তু এভাবে গুম করা হবে কেন?

তার দাবি, “অপরাধী হয়ে থাকে অপরাধের সাজা আপনার জেলে দেন আইনা। পাঁচ বছর গেছে আরো ১০ বছর দেন আপত্তি নাই। সরকারের কাছে ইডাই আমার আবেদন, আমরা লোকগুলান ফেরত চাই।” 

রায়পুরা উপজেলা শুধু নয় পুরো নরসিংদীর অনেকেই ওই ঘটনা জানেন। ২০১৮ সালে স্থানীয় এমপি রাজি উদ্দীন আহমেদ রাজু নিজ এলাকায় এক সভায় বক্তৃতায় রূপ মিয়ার প্রসঙ্গে কথা বলেন। ওই বক্তৃতাটি এখনো রায়পুরা যুবলীগ নামের একটি ফেইসবুক পেইজে রয়েছে। 

বক্তব্যের এক পর্যায়ে এমপিকে বলতে শোনা যায়- “মনে রাইখো মাছের পেটে যাইও না। রূপ মিয়া টুপ মিয়া পুলিশ তাদের কোথায় খাইয়া ফালাইছে তাদের – পুলিশ জানে। পুলিশ করতে পারে না এমন কোনো কাজ নাই। একদিন দেখবা টুপ করে তোমারে ধইরা নিয়া গেছে।”

বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের স্থানীয় বাসীন্দারাও সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “বলার মতো কোনো ভাষাই আমার কাছে নাই। তারপরেও বলি। আমার বাচ্চাগুলোর দিক তাকায়া আপনারা চেষ্টা করেন। আমার তিনটা বাচ্চা। আমি কীভাবে চালাবো। মানুষের বাড়ি থাইকা কাজ কইরা আইনা আইনা খাই। এমনও দিন যায় পোলাপানরে না খাওয়াইয়া রাখি।”

পরিবার এবং স্থানীয়দের দাবি আজিজুলকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায় রূপ মিয়া মেম্বারের সাথে। বাঁশগাড়ী ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মারামারি সংঘর্ষের মামলায় আসামী ছিলেন রূপ মিয়া মেম্বার। তার স্ত্রী নাসিমার প্রশ্ন অপরাধ করলে সাজা হোক কিন্তু এভাবে গুম করা হবে কেন?

তার দাবি, “অপরাধী হয়ে থাকে অপরাধের সাজা আপনার জেলে দেন আইনা। পাঁচ বছর গেছে আরো ১০ বছর দেন আপত্তি নাই। সরকারের কাছে ইডাই আমার আবেদন, আমরা লোকগুলান ফেরত চাই।” 

রায়পুরা উপজেলা শুধু নয় পুরো নরসিংদীর অনেকেই ওই ঘটনা জানেন। ২০১৮ সালে স্থানীয় এমপি রাজি উদ্দীন আহমেদ রাজু নিজ এলাকায় এক সভায় বক্তৃতায় রূপ মিয়ার প্রসঙ্গে কথা বলেন। ওই বক্তৃতাটি এখনো রায়পুরা যুবলীগ নামের একটি ফেইসবুক পেইজে রয়েছে। 

বক্তব্যের এক পর্যায়ে এমপিকে বলতে শোনা যায়- “মনে রাইখো মাছের পেটে যাইও না। রূপ মিয়া টুপ মিয়া পুলিশ তাদের কোথায় খাইয়া ফালাইছে তাদের – পুলিশ জানে। পুলিশ করতে পারে না এমন কোনো কাজ নাই। একদিন দেখবা টুপ করে তোমারে ধইরা নিয়া গেছে।”

এ বক্তব্য প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য রাজিউদ্দীন আহমেদ রাজু টেলিফোনে বিবিসিকে বলেন, “অনেক সময় পরিস্থিতি বুঝে বক্তব্য দিতে হয়”। 

নিখোঁজ চারজনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ওই দিন পুলিশ আক্রান্ত হয়েছিল তাদের অস্ত্র কেড়ে নিয়েছিল। তারপর চারজন নিখোঁজ হয়। আমি হোম মিনিস্টারকে জানিয়েছিলাম। তৎকালীন এসপি আমিনা বেগম নিজে গিয়েছিলেন অপারেশনে। তার পরে আর বলতে পারবো না। তাদের পরিবার আমার কাছে আসছিল। তাদের কোনো হদিস নাই।”

এদিকে স্থানীয়রা জানান চারজনকে ধরে নেয়ার সময় বাধা দেয়ায় গ্রামবাসীর সাথে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বাধে। 

ওইদিন পুলিশের ছররা গুলিতে আহত একজন বলেন, “একজন আসামী আর তিনজন ভাল মানুষ নিয়া যাইতে লইছিল। আমরা বাধা দিছি, যে হেরাতো আসামী না হেরারে কেন নিয়া যাইতেছেন। পরে পুলিশ আমাদের উপর গুলি করছে। গুলিতে একজন মারাও গেছে।

তবে এই চারজনের নিখোঁজ হবার পর পরিবার কেউ থানায় জিডি করেনি। চারজনের অপহরণে ঘটনায় থানা বা আদালতে কোনো মামলাও হয়নি। তবে ওই ঘটনার চার দিন পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে একটি অভিযোগ করেছিলেন নিখোঁজ এক ব্যক্তির পরিবারের সদস্য। আর নভেম্বর মাসে পুলিশ মহাপরিদর্শক বরাবর অনলাইনেও একটি অভিযোগ দায়ের করেন মোস্তফা আহমেদ নামে একজন। 

নিখোঁজ হাবিব মেম্বারের ভাই ছফিত উল্লাহ নিখোঁজদের সন্ধানে তৎপরতা সম্পর্কে বলেন বলেন, “দুইটা লোক গেছিল তদন্ত করবার। দুইডা লোকেরে ধইরা নিয়া পিস্তল দেহায়া গুলি করছে। বলে চারজনরে গুম করছি তরেও গুম কইরা এলাম, এ ভয়ে আমরা কোন দিক যাই না। পুলিশও তদন্ত মদন্ত এ পর্যন্ত আর আইছে না”। 

নিখোঁজদের পরিবারের দাবি, এ ঘটনার পর এমন ভয়-আতঙ্ক সৃষ্টি হয় যে কেউ থানায় মামলা কিংবা জিডি করতে পারেনি। 

চারজনের সন্ধানে নামার কারণেও একাধিক ব্যক্তিকে আক্রান্ত হতে হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। আজিজুলের ভাই হরুন মিয়ার অভিযোগ, পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে পায়ে গুলি করে, অস্ত্র মামলা দেয়। তার পা কেটে ফেলতে হয়। সে এখন পঙ্গু।

আজিজুল ইসলামের ভাই হরুন মিয়া এখন পঙ্গু

তিনি বলেন, “আমরা আওয়ামী লীগ পরিবার। আমি নিজে বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতি। আমার পা নাই। আমার ভাই গুম। আমি চাই যে আমার ভাই ফেরত আসুক। এটা সরকারের কাছে আমার দাবি।” 

এসব অভিযোগ আর নিখোঁজদের ব্যাপারে তদন্ত নিয়ে রায়পুরা থানায় গিয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) কেউই এ বিষয়টি নিয়ে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। ওই সময়ে তারা ছিলেন না এটিও উল্লেখ করেন। 

যদিও ওই ঘটনার পরদিন ২৭শে মে পুলিশ বাদি হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছিল। রায়পুরা থানার এস আই মোহাম্মদ রইজুল আলম (বিপি নং ৬৫৮৬০৭৫৫০৩) মামলার এজাহারে রূপ মিয়াকে কুখ্যাত সন্ত্রাসী অভিহিত করে গ্রেপ্তার করার পর স্থানীয়রা তাকে ছিনিয়ে নেয় বলে উল্লেখ আছে। 

ওই মামলায় নিখোঁজ চারজনসহ ২৩ জনের নাম উল্লেখ ছাড়াও অজ্ঞাত দুই শতাধিক আসামী ছিল। 

রায়পুরা থানায় গিয়ে এ বিষয়ে কী তদন্ত হয়েছে বা তাদের সন্ধানে কোনো তদন্ত হয়েছে কিনা এ প্রশ্নে রায়পুরা থানা কোনো তথ্য দেয়নি। নরসিংদি জেলার পুলিশ সুপারও কার্যালয় থেকেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুরোনো ঘটনা বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান জেলা পুলিশ সুপার এবং রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) উভয়ই। 

এ ব্যপারে মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেন, “সেই সময়কার ঘটনা জানি না সেটা কিন্তু যিনি বলেছেন, সেটা তার জন্য সত্যি কথা বলতে কি অযোগ্যতারই প্রমাণ রাখে। এটা কিন্তু যোগ্যতার প্রমাণ রাখে না, তার দক্ষতার প্রমাণ রাখে না, পেশাগত একটা অবস্থানের প্রতি যে আনুগত্য থাকার কথা সেটার প্রমাণ রাখে না। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।”

২০১৭ সালের ২৭শে মে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে


“সবসময় এটা হচ্ছে একে অপরকে দোষারোপ করছে। আমরা করি নাই। অন্যরা করেছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী যখন করছে তখন বলছে অরাষ্ট্রীয় কেউ এটা করে থাকতে পারে। মূল কথা হচ্ছে দেশে যদি একটা অঘটন ঘটে যেটা আইন শৃঙ্খলা সম্পর্কিত, সেটার প্রতিকার দেয়ার দায়িত্ব কিন্তু রাষ্ট্রের।” 

বাংলাদেশে গুম পরিস্থিতি এবং এর তদন্ত নিয়ে দেশি বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা বরাবরই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। আর সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়টি নিয়ে বরাবরই অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা যায়। 

সুলতানা কামাল বলেন, “রাষ্ট্র এখানে কোনো দায়-দায়িত্ব নিচ্ছে না। জবাবদিহির সম্মুখীন হতে চাইছে না। কিন্তু রাষ্ট্রেরই জবাবদীহি করতে হবে এসব ব্যাপারের প্রতি। আজকে না করুক কালকে না করুক, ইতিহাসের কাছে তো তাদের জবাবদিহি করতে হবে। কখনো না কখনো তো বাংলাদেশ সম্পর্কে মানুষ বলবে, লিখবে যে, এই দেশটাতে এরকমভাবে মানুষ গুম হয়ে যেতো, এরকমভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটতো। 

“এখন এটা যদি রাষ্ট্র করে না থাকে, রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে সেটা প্রমাণ করে দেয়া। যে না আমরা এটা করছি না এটা অন্য জায়গা থেকে হচ্ছে। সেটার জন্য তো তদন্ত সুষ্ঠুভাবে করতে হবে এবং মানুষের সামনে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে হবে।”

নিরাপত্তা বাহিনীর পরিচয়ে আটকের পর নিখোঁজ পরিবারগুলো বরাবরই দাবি করে আসছে যে ঘটনাগুলো দায়সারা তদন্ত হয়। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর সংগঠন মায়ের ডাকের সমন্বয়ক আফরোজা ইসলাম আখিঁ বলেন, “মায়েরা সন্তারা, স্ত্রীরা খুব করুণভাবে কান্না করে প্রশাসনকে বলে আসতেছে যে আপনারা আমাদের স্বজনকে নিয়ে গেছেন। জলজ্যান্ত সবার সামনে থেকে নিয়ে গেছেন তাদের ফেরত দেন। 

“ওনারা এই পর্যন্ত হদিস দেন নাই। ফেরত দেয় নাই। ওনাদের ওপর তো আমাদের আস্থা নাই। গুম পরিবারের কোনো আস্থা নাই। আমরা গুমের প্রতিটা মানুষদেরকে ফেরত চাই। যারা খুন হয়েছে তাদের বিচার চাই।” 

বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ প্রসঙ্গে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলাদা অনুষ্ঠানে দাবি করেছেন যে বাংলাদেশ কোনো গুম হয় না, তারা আত্মগোপনে থাকে। 

দুই মন্ত্রীর বক্তব্য এমন সময় এলো যখন জাতিসংঘের গুম বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের বিশেষজ্ঞ কমিটি ২৪টি দেশের তিনশো’ ঘটনা পর্যালোচনায় বসেছে। ধারণা করা হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশেরও বেশকিছু গুমের ঘটনার তদন্ত নিয়ে বিশ্লেষণ করা হবে ১১ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ দিনের এ বৈঠকে।

(সুত্র বিবিসি)

Leave a Reply

Your email address will not be published.